• শিরোনাম

    বন্ধ দোকানের

    বন্ধ দোকানের শাটারে জন্মাচ্ছে এডিস

    নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১১ আগস্ট ২০২১

    বন্ধ দোকানের শাটারে জন্মাচ্ছে এডিস

    ‘মশার গান আর শুনতে চাই না’- কথাটি বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছরের ৩০ মার্চ ঢাকায় ডেঙ্গুর উপদ্রবে বিরক্তি প্রকাশ করে ঢাকার দুই মেয়রকে উদ্দেশ করে এ কথা বলেছিলেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের এক বছর পর ফের মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নগরবাসী। রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় আরও ২২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

    ডেঙ্গু দমনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চিরুনী অভিযান চালাচ্ছে। বাসাবাড়ি, অফিস, হাসপাতাল সব ধরনের স্থাপনা ও আশপাশে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। যেখানে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হচ্ছে, সেসব স্থাপনা মালিকদের জরিমানা করা হচ্ছে। সময়ে সময়ে ওষুধ ছটানো হচ্ছে ড্রেন, আনাচ-কানাচে। নারিকেলের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, টব, পানি জমতে পারে এমন সব বস্তু অপসারণ করা হচ্ছে।
    কিন্তু বিধিনিষেধের কারণে বন্ধ দোকানের শাটারে জমা পানি অনেকটাই নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। সেখানেও জন্মাচ্ছে এডিস মশার লার্ভা। গত শুক্র, শনি ও গতকাল রাজধানীর ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকায় এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে অনায়াসে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা। আর মশার প্রজনন উপযোগী জায়গা হয়ে উঠেছে বন্ধ দোকানের শাটার ও শাটারের নিচের অংশে।

    সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকার ১৭টি এলাকায় এডিসের প্রকোপ বেশি। রামপুরা, মহাখালী, মগবাজার, সিদ্ধেশ্বরী, শান্তিনগর, ক্যান্টনমেন্ট, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, পল্টন, খিলগাঁও, মিরপুর, বসুন্ধরা, মুগদা, বাসাবো, সবুজবাগ, বাড্ডা ও মোহাম্মদপুর এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

    মুগদা, বাসাবো, সবুজবাগ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশের খালি জায়গায় পড়ে রয়েছে ফেলে দেয়া ফুলের টব, আইসক্রিম-দইয়ের বাটি। জলাধারে দেখা মিলেছে পলিথিন ও কর্কসিট। এসবের মধ্যে জমে আছে বৃষ্টির পানি। এতে এডিস মশার জন্ম স্বাভাবিক বিষয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
    এ ছাড়া এসব এলাকায় খাবার দোকান বাদে অন্যান্য বেশির ভাগ দোকানই এখন বন্ধ। করোনা মহামারি ঠেকাতে বিধিনিষেধের কারণে বন্ধ দোকানের শাটারের উপরের অংশে জমছে বৃষ্টির পানি। আর সেই পানিতে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা। একই চিত্র শাটারের নিচের অংশেও।

    রাজধানীর মিরপুর, মনিপুর, শেওড়াপাড়া, গাবতলী, মোহাম্মদপুর এলাকার বন্ধ দোকানের শাটারের উপরে ও নিচেও একই অবস্থা দেখা গেছে।

    শাটারের ভেতরে এডিস জন্ম নিচ্ছে, বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে মশক নিধন কর্মীদের। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করা হলে তারা জানান, শাটারের উপরের অংশে বাইরে থেকে দেখার সুযোগ নেই। আর সে জায়গাগুলো পরিষ্কার করারও সুযোগ নেই। ফলে নিচ থেকে যেটুকু সম্ভব সেটুকু কাজ করার চেষ্টা করছেন তারা।

    ঢাকা টাইমসের এমন তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহমুদা আলী। তিনি করপোরেশনের অঞ্চল-২ এর ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মশক নিধন কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন।
    ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে মাহমুদা আলী বলেন, ‘শাটারের ভাঁজে এবং নিচের জায়গায় এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। আমরা এমনটা অনেক জায়গাতেই পেয়েছি। এ ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জায়গাগুলোর দিকে আমাদের আরও বেশি নজর দিতে হবে।’

    রাজধানীতে এডিস মশার ১৭টি হটস্পটের অন্যতম মিরপুর। এ এলাকার এডিসের প্রাদুর্ভাব কমানো কেন সম্ভব হচ্ছে না জানতে চাইলে ডা. মাহমুদা আলী বলেন, ‘এডিস বাসাবাড়িতে থাকে, অফিসে থাকে। আমরা মানুষের বাসার ছাদে যাচ্ছি, কিন্তু বেলকনিতে তো যেতে পারছি না। এখানে যার যার ঘরের দায়িত্বটা তাকে নিতে হবে। এখানে সবার অংশগ্রহণ দরকার। আমরা একটা ওয়ার্ডকে দুভাবে ভাগ করেছি। প্রতি এলাকায় সপ্তাহে দুবার করে মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।’

    মশার ডিম থেকে লার্ভা হতে তিন দিন এবং লার্ভা থেকে মশা হতে দুই দিন অর্থাৎ ডিম থেকে মশা হতে মোট পাঁচ দিন সময় লাগে বলে জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

    এদিকে উত্তর সিটির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মশক নিধন সুপারভাইজার আব্দুল কাইয়ূম ঢাকা টাইমসকে জানান, এই ওয়ার্ডের প্রতি এলাকায় সপ্তাহে এক দিন মশক নিধন ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।

    এডিসের মশার ডিম থেকে মশায় পরিণত হতে মোট পাঁচ দিন সময় লাগে। সপ্তাহে এক দিন অর্থাৎ ছয় দিন পরপর ওষুধ ছিটালে সেটা আদৌ কোনো কাজে আসছে কি না জানতে চাইলে এর কোনো সরাসরি জবাব দেননি সুপারভাইজার আব্দুল কাইয়ূম।

    ওয়ার্ডটির বেড়িবাঁধ সড়কের দুই পাশে স্থানীয় টায়ার ব্যবসায়ীরা গাড়ির টায়ার জমিয়ে রাখছেন। ১৫ থেকে ২০ দিনের জমা টায়ার একত্রে নিয়ে যাওয়া হয় পাইকারদের কাছে। এই সময়ের মধ্যে সড়কে খোলা অবস্থায় রাখা টায়ারে জমা হয় বৃষ্টির পানি। আর সেই পানিতে অনায়াসে এডিসের ডিম পরিপক্ব হয়ে লার্ভায় এবং এরপর মশায় পরিণত নেয়। চোখের সামনে এডিসের এই বংশবিস্তার হলেও নজর পড়ছে না সিটি করপোরেশনের লোকজনের।

    মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের টায়ার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা টায়ার কিনে আনি। আমাদের কিছু লোক আছে, তারাও কিনে এনে আমাদের কাছে বিক্রি করে। আমরা সবগুলো জমিয়ে ১৫-২০ দিন পর একসঙ্গে পাইকারের কাছে বিক্রি করি।’

    বেড়িবাঁধের টায়ারের দোকানে সর্বশেষ কবে মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মশক নিধনের সুপারভাইজার আব্দুল কাইয়ূম।

    তবে ডেঙ্গু দমনে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। প্রতিদিনই বাড়ি, স্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালানো হচ্ছে। ডেঙ্গু লালনের দায়ে জরিমানা করা হচ্ছে স্থাপনা মালিকদের।

    ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খুলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এডিসের প্রজননস্থলের বিষয়ে করপোরেশনের এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানালে সেখানে ছুটে যাচ্ছে দক্ষিণ সিটির কর্মীরা। মেয়র শেখ তাপস বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যান সময় সময়।

    এদিকে ডেঙ্গু দমনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে চলছে চিরুনী অভিযান। যেখানে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হচ্ছে, সেসব স্থাপনা মালিকদের জরিমানা করছে উত্তর সিটির ভ্রাম্যমাণ আদালত।

    উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম করপোরেশন এলাকার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে নগরবাসীকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। বাড়ি, স্থাপনা, অফিসসহ কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে নগরবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।

    (ঢাকাটাইমস/৮আগস্ট/মোআ)

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    যেভাবে উদ্ধার ৭৮ জন

    ২৬ মার্চ ২০১৭